প্রবারণা পূর্ণিমা উৎসব: রথযাত্রা ও ফানুসের আলোয় পাহাড়ে-সমতলে বর্ণিল আয়োজন
26 October 2026 —
প্রবারণা পূর্ণিমা উৎসব উপলক্ষ্যে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, হাজার প্রদীপের আলো ও রঙিন ফানুস ওড়ানোর মধ্য দিয়ে বর্ণিল আয়োজনে মুখরিত হয়ে উঠেছে দেশ। পার্বত্য জেলা বান্দরবান থেকে শুরু করে রাজধানী ঢাকার বুদ্ধ মন্দিরগুলোতে শ্রদ্ধা, ভক্তি ও আনন্দে উদযাপন করা হচ্ছে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান এই ধর্মীয় উৎসব। তিন মাসব্যাপী বর্ষাবাস উদযাপন শেষে আশ্বিনী পূর্ণিমার এই পুণ্য তিথিতে বিশ্বজগতের সকল প্রাণীর সুখ, শান্তি ও সার্বিক কল্যাণ কামনায় বিশষে প্রার্থনায় মিলিত হন পুণ্যার্থীরা।
পাহাড়ি জেলা বান্দরবানে প্রবারণা পূর্ণিমা উৎসবকে ঘিরে শহর থেকে শুরু করে দুর্গম পাহাড়ি পল্লিগুলোতে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় মারমা সম্প্রদায়ের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় এই আয়োজনটি ‘ওয়াগ্যেই পোয়ে’ নামে পরিচিত। তিন দিনব্যাপী বর্ষীয়ান এই উৎসবের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় জেলা শহরের ঐতিহ্যবাহী রাজার মাঠে। মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্বালন ও বর্ণাঢ্য উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী সাচিংপ্রু জেরী এবং সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। উদ্বোধন পর্ব শেষে স্থানীয় পাহাড়ি শিল্পীদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় মনোরম সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
উৎসবের দ্বিতীয় দিনে জেলার প্রতিটি বৌদ্ধবিহারে সকাল থেকে শুরু হয় ছোয়াইং দান, বুদ্ধপূজা ও সমবেত প্রার্থনা। বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় এই আয়োজনের প্রধান আকর্ষণ ঐতিহ্যবাহী রথযাত্রা। ময়ূর আকৃতির একটি বিশাল সুসজ্জিত রথ টেনে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করেন নানা বয়সের হাজারো মানুষ। ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি রথযাত্রার এই মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত পর্যটকদের সমাগম ঘটে। শহর পরিক্রমা শেষে রাতে রথটি আনুষ্ঠানিকভাবে সাঙ্গু নদীতে বিসর্জন দেওয়া হয়। সন্ধ্যার পর পাহাড়ের নৈশ আকাশে একসঙ্গে শত শত ফানুস বাতি উত্তোলন করা হলে পুরো এলাকা এক মায়াবী আলোয় রঙিন হয়ে ওঠে।
রাজধানী ঢাকাতেও অত্যন্ত শ্রদ্ধাপূর্ণ পরিবেশে পালিত হচ্ছে এই ধর্মীয় উৎসব। বাড্ডার আন্তর্জাতিক বুদ্ধ বিহারে প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষ্যে আয়োজন করা হয় বিশেষ ফানুস উৎসবের। প্রদীপ প্রজ্বালনের পর বিশ্বশান্তি ও অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিতে মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে আকাশে উড়ানো হয় হরেক রঙের ফানুস। হাজারো প্রদীপের দীপ্তি আর ফানুসের মায়াবী আলোয় আলোকময় হয়ে ওঠে গোটা মন্দির এলাকা। এতে রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে আগত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ ও দর্শনার্থীরা অংশ নেন।
প্রবারণা পূর্ণিমার ছুটি ও এই উৎসবকে কেন্দ্র করে পাহাড় ও সাগরের পর্যটন শহরগুলোতে দেখা গেছে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড়। বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও কক্সবাজারমুখী যাত্রীদের চাপ সামলাতে ও ভ্রমণ সহজ করতে প্রযুক্তিনির্ভর অনলাইন বাস টিকিট প্ল্যাটফর্মগুলোর চাহিদা ছিল লক্ষণীয়। শেষ মুহূর্তের ভোগান্তি এড়াতে অনলাইনের মাধ্যমেই যাত্রীরা ঘরে বসে আগাম ও রিটার্ন টিকিট বুকিং করার সুবিধা পেয়েছেন, যা উৎসবের আনন্দে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মূলত প্রবারণা পূর্ণিমা শুধু একটি ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি অহিংসা, মৈত্রী, সৌহার্দ্য ও মানবিক সম্প্রীতির বার্তা বহন করে। পাহাড় ও সমতলের মানুষের মেলবন্ধনে এই উৎসব জাতীয় সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ হিসেবে বিরাজ করছে।
Published with WpNewblog — www.rameshpoudel.com