প্রশ্নফাঁস চক্রের ৭ সদস্য গ্রেপ্তার: সরকারি চাকরির পরীক্ষায় জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর তথ্য উন্মোচন
23 October 2026 —
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ডিজিটাল উপায়ে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও উত্তর সরবরাহকারী একটি সংঘবদ্ধ প্রশ্নফাঁস চক্রের সন্ধান পেয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ঘটনায় রাজধানীর একটি পরীক্ষা কেন্দ্রে জালিয়াতির সময় হাতেনাতে আটক এক নারী পরীক্ষার্থীকে এক মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের পাঁচ কর্মচারীসহ ওই জালিয়াতি চক্রের মোট সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-৩)।
সংবাদ সম্মেলনে এসআরবি-৩-এর অধিনায়ক জানান, সম্প্রতি রাজধানী ঢাকা ও সাভারের বিভিন্ন এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে এই জালিয়াতি চক্রের মূল হোতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কম্পিউটার অপারেটর ও অফিস সহায়কের দায়িত্বে থাকা একাধিক কর্মী, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহকারী এবং দুজন চাকরিপ্রার্থী। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচালিত বিশেষ অভিযানে তাঁদের হেফাজত থেকে ডিজিটাল অপরাধে ব্যবহৃত আটটি আধুনিক স্মার্টফোন, ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্রের সেট, বিপুল পরিমাণ নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্র, মূল সনদপত্র, বিভিন্ন ব্যাংকের সই করা চেক এবং নগদ অর্থ জব্দ করা হয়েছে।
মামলার বিবরণ ও অনুসন্ধানে জানা যায়, সম্প্রতি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ২৪২টি সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের বিপরীতে তিন লক্ষাধিক প্রার্থী পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল। পরীক্ষা শুরুর কিছুক্ষণ পূর্বেই ডিজিটাল মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়। জালিয়াতির সত্যতা মেলায় কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষাটি স্থগিত ঘোষণা করে এবং মতিঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। পরবর্তীতে এসআরবির গোয়েন্দা শাখা ডিজিটাল ফরেনসিক ও মোবাইল মেসেজিং অ্যাপের চ্যাট হিস্ট্রি পর্যালোচনা করে এই জালিয়াতির পুরো নকশা উন্মোচন করে।
ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষায় প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, পরীক্ষার দিন ভোরে চক্রের এক সদস্যের মোবাইলে অজ্ঞাত উৎস থেকে প্রশ্নপত্রের একটি অস্পষ্ট ছবি আসে। পরবর্তীতে জালিয়াতি চক্রটির অন্য সদস্যরা নিজস্ব স্মার্টফোনে প্রশ্নপত্রটির সম্পূর্ণ পরিষ্কার ছবি সংগ্রহ করে নিজ উদ্যোগে উত্তরপত্র তৈরি করে। এরপর চুক্তিভিত্তিক পরীক্ষার্থীদের স্মার্টফোনে মেসেজিং অ্যাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গোপন গ্রুপের মাধ্যমে প্রশ্ন ও তার সমাধান পৌঁছে দেওয়া হতো।
এসআরবি আরও জানায়, এই চক্রটি চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে নিয়োগের নিশ্চয়তা দিয়ে মাথাপিছু ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল। অর্থ লেনদেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে সই করা ফাঁকা ব্যাংক চেক এবং নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তি করাত। এমনকি জালিয়াতি চক্রের শিকার হয়ে আর্থিক ক্ষতি পোষাতে পরবর্তীকালে এই চক্রেই সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ার প্রমাণ মিলেছে এক সদস্যের বিরুদ্ধে। গ্রেপ্তার হওয়া একাধিক অভিযুক্তের পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি জালিয়াতিতেও সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
এর আগে পরীক্ষা কেন্দ্রে গোপনে স্মার্টফোনে প্রশ্নপত্রের ছবি তুলে বাইরে পাঠানোর চেষ্টা করার সময় এক নারী পরীক্ষার্থীকে আটক করেন কেন্দ্র পরিদর্শক। পরবর্তীতে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত অপরাধ স্বীকারের ভিত্তিতে তাঁকে এক মাসের কারাদণ্ড প্রদান করেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মীদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই নেটওয়ার্কের মূল উৎসের সন্ধানে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।
Published with WpNewblog — www.rameshpoudel.com