এসএমআর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে বাংলাদেশের নতুন উদ্যোগ
9 October 2026 —
বাংলাদেশে বৃহৎ আকারের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি তুলনামূলক কম ক্ষমতার আধুনিক এসএমআর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সম্ভাবনা যাচাই প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। কৌশলগত উদ্যোগের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চিহ্নিত চারটি সম্ভাব্য অঞ্চলের মধ্যে জামালপুরের মাদারগঞ্জ চর এলাকা সম্প্রতি পরিদর্শন করেছে চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান চায়না এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের (সিইইসি) একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ দল। জাতীয় গ্রিডে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ সরবরাহ বৃদ্ধিতে আঞ্চলিক পর্যায়ভিত্তিক এই ক্ষুদ্র পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রযুক্তিকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
বিপিডিবি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ক্ষুদ্র ও মডিউলার পারমাণবিক বিদ্যুৎপ্রযুক্তি সম্ভাব্যতা মূল্যায়নে সিইইসি-এর সাথে একটি অ-বাধ্যতামূলক সমঝোতা স্মারক সই করেছে সংস্থাটি। বিপিডিবির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, প্রাথমিক রূপরেখা অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে ছোট ও মাঝারি আকারের মডিউলার পারমাণবিক চুল্লি বসানো হবে। এসব কেন্দ্র থেকে সমন্বিতভাবে ২০০ থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। জামালপুরের মাদারগঞ্জ ছাড়াও চীনা কারিগরি প্রতিনিধি দলটি শিগগিরই পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীসহ নির্ধারিত অন্যান্য এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করবে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সংজ্ঞায়িত কাঠামো অনুযায়ী, একক ইউনিটে সর্বোচ্চ ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষম চুল্লিকে সাধারণত স্মল মডিউলার রিঅ্যাক্টর বা এসএমআর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বলা হয়ে থাকে। ঐতিহ্যবাহী বিশাল পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোর তুলনায় এসএমআর প্রযুক্তির মূল সুবিধা হলো—এর প্রধান যন্ত্রাংশ ও সুরক্ষা ব্যবস্থা উন্নত কারখানায় আগেই মডিউল আকারে তৈরি করা সম্ভব হয়। পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের নির্ধারিত স্থানে পরিবহন করে সেগুলো সমন্বিতভাবে সংযোজন করা যায়। এই সহজ ও নিরাপদ মডিউলার নকশার কারণে ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো সহজতর হয়।
তবে যেকোনো স্থানে পারমাণবিক প্রকল্প বাস্তবায়নের পূর্বে বেশ কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বিপিডিবি চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, স্থান উপযোগী কি না, প্রকল্পের সার্বিক নিরাপত্তা, পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব, অর্থনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং পারমাণবিক নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় অনুমোদন পাওয়ার পরেই প্রকল্প অনুমোদনের চূড়ান্তে পৌঁছানো সম্ভব হবে। সব ধরনের প্রাথমিক যাচাই ও সমীক্ষা শেষ হলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সার্বিক সহায়তায় ও তদারকিতে বাস্তব রূপায়নের পথে এগোবে বিপিডিবি।
অন্য এক প্রসঙ্গে বিপিডিবি প্রধান জানান, দেশের প্রথম বৃহৎ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ও দ্বিতীয় ইউনিটের চূড়ান্ত কমিশনিং সম্পর্কিত সর্বশেষ অগ্রগতির তথ্য পেতে এখনো অপেক্ষা করতে হচ্ছে। বর্তমানে রূপপুরের উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রির জন্য বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি বা পিপিএ নির্ধারণী আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। এর আগে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি বিপিডিবি রূপপুরের বিদ্যুতের আনুমানিক দাম প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ৬ টাকা ৭২ পয়সা প্রাক্কলন করলেও প্রকল্পের পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিচালন ব্যয় হাতে পাওয়ার আগে চূড়ান্ত মূল্য নির্ধারণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, রূপপুরের মেগা পারমাণবিক কাঠামোর বাইরে বিকল্প ও দ্রুত স্থাপনযোগ্য এসএমআর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চিন্তা বাংলাদেশের জ্বালানি বহুমুখীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে সমঝোতা চুক্তি বা প্রারম্ভিক পরিদর্শনের অর্থই নির্মাণ কাজ শুরু নয়। প্রযুক্তির সঠিক নির্বাচন, ভূ-রাজনৈতিক ও পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে নতুন এই পারমাণবিক অধ্যায়ের সুফল তুলে নিতে পারবে বাংলাদেশ।
Published with WpNewblog — www.rameshpoudel.com