এআই দিয়ে ভুয়া সংবাদ তৈরি: গাইবান্ধার নেটওয়ার্ক উন্মোচন করল অ্যানথ্রপিক
17 September 2026 —
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবট ‘ক্লড’ ব্যবহার করে এআই দিয়ে ভুয়া সংবাদ ও রাজনৈতিক অপপ্রচার চালানোর অভিযোগে বাংলাদেশে পরিচালিত একটি স্বয়ংক্রিয় তথ্যপ্রযুক্তি নেটওয়ার্ক শনাক্ত করেছে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। গাইবান্ধা জেলাভিত্তিক এক ব্যক্তি কর্তৃক পরিচালিত এই কার্যক্রমে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বানোয়াট প্রতিবেদন ও ছবি তৈরির নির্দেশনা তৈরি করা হতো। তদন্ত শেষে অপপ্রচারে ব্যবহৃত ২৯টি ক্লড অ্যাকাউন্ট স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিয়েছে মার্কিন এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি।
অ্যানথ্রপিকের প্রকাশিত ‘ডিটেক্টিং অ্যান্ড কাউন্টারিং মিসইউজ অব এআই’ শীর্ষক এক নিরাপত্তা প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে এই অপপ্রচার কার্যক্রমকে ‘জিটিজি-৫৪০০৬’ সংকেতে চিহ্নিত করা হয়। তদন্তে দেখা যায়, প্রায় ১৬ মাস ধরে চলা এই সাইবার কার্যক্রমে ‘ফেক_নিউজ_৩.পিওয়াই’ নামক একটি কাস্টম সফটওয়্যার বা স্ক্রিপ্ট ব্যবহার করা হয়েছিল। এই সফটওয়্যারটি সরাসরি ক্লডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাচ আকারে রাজনৈতিক ভুয়া সংবাদ তৈরির কাজ করত।
প্রতিষ্ঠানটির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পুরো প্রক্রিয়াটিতে অন্তত ১ হাজার ৫০০টি সংবাদ শিরোনাম, ৩০০টি পূর্ণাঙ্গ বানোয়াট রাজনৈতিক প্রতিবেদন এবং ১ হাজার ৫০০টি এআই ছবি তৈরির প্রম্পট তৈরি করা হয়েছিল। মূল পরিচালনাকারী ব্যক্তি আইপি ও পরিচয় আড়াল করতে ঘুরেফিরে ২৯টি পৃথক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করতেন। স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি এই বিভ্রান্তিকর তথ্যগুলো প্রথমে একটি ক্লাউড স্টোরেজে সংরক্ষণ করা হতো এবং পরবর্তীতে অডিও-ভিডিওতে রূপান্তর করে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া হতো।
অ্যানথ্রপিকের বিশ্লেষণে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় করার উদ্দেশ্যে তৈরি এই কনটেন্টগুলোতে মূলত চারটি প্রধান বয়ান চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে চরমপন্থী ভাবমূর্তি সৃষ্টি, তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে কাল্পনিক হত্যা পরিকল্পনার গল্প সাজানো, ছাত্রনেতাদের বিদেশি সংস্থার এজেন্ট হিসেবে চিত্রায়িত করা এবং বানোয়াট আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ছড়ানো অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিশেষ করে দেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠী ও সীমিত শিক্ষার সুযোগ পাওয়া মানুষদের লক্ষ্য করে এই সহজবোধ্য কিন্তু আক্রমণাত্মক কনটেন্টগুলো নকশা করা হয়েছিল।
অপপ্রচারের কারিগরি কাঠামোর অংশ হিসেবে ইউটিউব এপিআই ব্যবহার করে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ভিডিও আপলোডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। অ্যানথ্রপিকের মূল্যায়ন অনুযায়ী, এই অপপ্রচার ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটক—এই তিন প্রধান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানোর চেষ্টা চালানো হয়েছিল। এই ঘটনায় কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সরাসরি যুক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি, বরং একজন ব্যক্তি একক উদ্যোগে এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে এই অপপ্রচার চালিয়েছেন।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর অ্যানথ্রপিক সংশ্লিষ্ট সকল ক্লড অ্যাকাউন্ট বাতিল করেছে এবং নতুন করে অপপ্রচারের চেষ্টা ঠেকানোর জন্য আচরণগত শনাক্তকরণ ব্যবস্থা জোরদার করেছে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, কম প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তি বা ক্ষুদ্র গোষ্ঠীও এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক পরিসরে বিভ্রান্তি ছড়াতে সক্ষম হচ্ছে। ফলে এআই দিয়ে ভুয়া সংবাদ প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক পর্যায় ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত নজরদারি এখন সময়ের দাবি।
Published with WpNewblog — www.rameshpoudel.com