সার্বভৌম এআই অবকাঠামো গড়বে বাংলাদেশ: ১২ মাসে চালুর লক্ষ্য
4 November 2026 —
বিদেশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জাতীয় প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করতে আগামী ১২ মাসের মধ্যে নিজস্ব সার্বভৌম এআই অবকাঠামো চালুর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। তৈরি হতে যাওয়া এই প্রযুক্তিগত ভিত্তি দেশের সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, প্রতিশ্রুতিশীল স্টার্টআপ, বিশ্ববিদ্যালয় ও স্বাধীন গবেষকদের জন্য ব্যবহারের উন্মুক্ত সুযোগ তৈরি করবে। সম্প্রতি এ বিষয়ে নিশ্চিত করে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ জানিয়েছেন, উচ্চমানের কম্পিউটিং চিপ ও মেমোরি মডিউল সংগ্রহের প্রাথমিক কাজ ইতোমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও আন্তর্জাতিক মানের উন্নত এআই মডেল পরিচালনা বা প্রশিক্ষণের মতো পর্যাপ্ত জিপিইউ শক্তি ও ডিজিটাল ডেটা সেন্টারের স্বল্পতা রয়েছে। এ ঘাটতির কারণে এতদিন দেশীয় প্রযুক্তিবিদদের বৈদেশিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ক্লাউড সেবার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হতো। এ সীমাবদ্ধতা কাটাতে সরকার শুরুতেই বিশাল কোনো স্থাপনা না বানিয়ে ছোট ও মডিউলার আকারে এ অবকাঠামো নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা পরবর্তীতে চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সাথে সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে।
এই বৃহৎ প্রকল্পের অন্যতম মূল লক্ষ্য হলো বাংলা ভাষাকেন্দ্রিক লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল (এলএলএম) প্রতিষ্ঠা করা। দেশীয় ভৌগোলিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে তৈরি করা এআই সেবাগুলো দেশের কৃষি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য ও নগর যোগাযোগ পরিচালনায় নতুন দিগন্তের সূচনা করবে। উদাহরণস্বরূপ, কৃষিতে আবহাওয়ার পূর্বাভাস, আকস্মিক বন্যার আগাম সতর্কতা, ঢাকার জটিল যানজট ব্যবস্থাপনা কিংবা পোশাকশিল্পের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এই স্থানীয় এআই প্রযুক্তি কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
এআই অবকাঠামোর উন্নয়নকে কেন্দ্র করে নতুন বৈদেশিক ও দেশীয় বিনিয়োগের জোর সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। সংস্থাটির নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন জানান, এআই ও সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি দেশের অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্য সংযোজন করবে। এতে ঐতিহ্যবাহী পোশাক খাতের মতো অগণিত কায়িক কাজের সুযোগ না সৃষ্টি হলেও প্রযুক্তিবিদ্যা, ডাটা সেন্টার পরিচালনা, চিপ ডিজাইনিং ও সাইবার নিরাপত্তায় উচ্চদক্ষ মানবসম্পদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে।
তবে এই জাতীয় উদ্যোগের সফলতা নিশ্চিত করতে সমন্বিত প্রস্তুতির আবশ্যিকতার কথা তুলে ধরেছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, শুধু ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ করলেই চলবে না; এর পাশাপাশি দরকার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, উচ্চগতির ইন্টারনেট, নির্ভুল তথ্যভান্ডার প্রস্তুতকরণ এবং আন্তর্জাতিক মানের সাইবার নিরাপত্তা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের সুদৃঢ় মেলবন্ধন ঘটিয়ে এআই, মেশিন লার্নিং ও ডেটা সায়েন্সে ব্যবহারিক শিক্ষার বিস্তার না ঘটালে দীর্ঘমেয়াদে প্রযুক্তি স্বাধীনতার এই সুফল ধরে রাখা কঠিন হবে।
পরিশেষে, সরকার ঘোষিত এই সার্বভৌম এআই অবকাঠামো নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে বৈশ্বিক প্রযুক্তি বিপ্লবের অগ্রভাগে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এক মাইলফলক। স্বকীয় ডেটা সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং দেশীয় উদ্ভাবকদের হাত ধরে আগামীর ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণে সরকারের এই সময়োপযোগী পরিকল্পনা কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
Published with WpNewblog — www.rameshpoudel.com