সরকারি ওয়েবসাইট বন্ধ সাইবার ঝুঁকি এড়াতে; ব্যাংকসহ ১০ পোর্টালে সতর্কতা
25 October 2026 —
আন্তর্জাতিক প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপির (PHP) মারাত্মক নিরাপত্তা ত্রুটি শনাক্ত হওয়ার পর দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি অবকাঠামোর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে সরকারি ওয়েবসাইট বন্ধ রাখার এক সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সম্ভাব্য সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ ১০টিরও বেশি প্রধান সরকারি দপ্তর ও বাণিজ্যিক ব্যাংকের অনলাইন পোর্টাল সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে। আইটি বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ডিজিটাল তথ্যসম্পদ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সিকিউরিটি প্যাচ হালনাগাদ ও সার্ভার ফায়ারওয়াল জোরদার করতেই মূলত এসব সার্ভিস স্থগিত করা হয়।
হঠাৎ করে এসব গুরুত্বপূর্ণ পোর্টাল বন্ধ থাকায় সাধারণ গ্রাহক ও সেবাগ্রহীতারা সাময়িক অস্বস্তিতে পড়েছেন। সাময়িকভাবে সেবা স্থগিত থাকা সাইটগুলোর তালিকায় রয়েছে দেশের শীর্ষ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক এবং ছয়টি বড় বাণিজ্যিক ব্যাংক—অগ্রণী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ইসলামী ব্যাংক, এসবিএসি ব্যাংক ও বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক। এছাড়া সরকারি সেবা ও তথ্য প্রদানকারী মূল প্রতিষ্ঠান বিজি প্রেস, ব্যানবেইস, পেট্রোবাংলা, শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট এবং ভূমি মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল ভূমিসেবা পোর্টালের (land.gov.bd) প্রধান সার্ভারও আপাতত বন্ধ রয়েছে।
প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা সূত্র থেকে জানা গেছে, বিশ্বজুড়ে বহুল ব্যবহৃত প্রোগ্রামিং ভাষা পিএইচপিতে এক ধরণের মারাত্মক মেমোরি ত্রুটি ধরা পড়ে। এর পরপরই বাংলাদেশ সরকারের সাইবার নিরাপত্তা তদারকি সংস্থা বিজিডি ই-গভ সার্ট (BGD e-GOV CIRT) সারাদেশে জরুরি রেড অ্যালার্ট জারি করে। এই সতর্কবার্তার প্রেক্ষিতে দেশের আর্থিক খাত ও প্রশাসনিক ডেটাবেজের চূড়ান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সংস্থার সহকারী প্রোগ্রামার এবং আইটি ইঞ্জিনিয়ারগণ দ্রুত কাজ শুরু করেন। ছুটির দিনগুলোতে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ চালিয়ে কারিগরি ত্রুটি সমাধানের চেষ্টা চলছে।
সাইবার বিশেষজ্ঞ এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ডিজিটাল ফরেনসিক বিভাগের বিশেষজ্ঞ শিক্ষক তানভীর হাসান জোহা এ বিষয়ে সতর্ক করে জানান যে, বাংলাদেশে প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষেত্রে নিয়োজিত সরকারি ওয়েবসাইটের প্রায় ৬০ থেকে ৮৫ শতাংশেই পিএইচপি প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ফলে এ ধরনের আন্তর্জাতিক ত্রুটি জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, ইন্টারনেটের সাথে যুক্ত থাকা সার্ভারগুলোতে অবিলম্বে পিএইচপির নিরাপদ ও হালনাগাদ সংস্করণ ইনস্টল করা জরুরি। তাছাড়া বিগত কয়েক দিনের সার্ভার লগ পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে যে পূর্বেই কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সাইবার অনুপ্রবেশ ঘটেছিল কি না।
এদিকে সাধারণ নাগরিকদের ভোগান্তি কমাতে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের চেষ্টা করছে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো। ভূমি মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, ডিজিটাল ভূমিসেবা জোরদার ও সার্ভার টেকনিকেল মেইনটেনেন্স নিশ্চিতে নির্ধারিত সময় ধরে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আইটি বিভাগ নিশ্চিত করেছে যে প্রতিটি সিস্টেমের খুঁটিনাটি পরীক্ষা এবং নিরাপত্তা সার্টিফিকেট পাওয়ার পরপরই পোর্টালগুলো পুনরায় জনসম্মুখে চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অফিস খোলার সাথে সাথেই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সেবা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক এই ঘটনাটি জাতীয় ডিজিটাল অবকাঠামো ও সাইবার সুরক্ষার সক্ষমতাকে আরও জোরদার করার তাগিদ দেয়। দ্রুত ও দক্ষতার সাথে ঝুঁকি চিহ্নিত করে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা সরকারের একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সাইবার হুমকি মোকাবিলায় সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তির ফায়ারওয়াল সংযোজন ভবিষ্যতে দেশের রাষ্ট্রীয় আইটি নেটওয়ার্ককে আরও নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য করে তুলবে।
Published with WpNewblog — www.rameshpoudel.com