কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারে নীতিগত জবাবদিহিতা নিশ্চিতের তাগিদ জাতিসংঘের
26 October 2026 —
কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির প্রয়োগ ও বিস্তার বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়লেও এর মাধ্যমে নীতিগত ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এড়ানোর সুযোগ নেই বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের নির্বাচিত সভাপতি ড. খলিলুর রহমান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ১৬তম ‘এনগেজিং বিজনেস ফোরাম’-এর মূল সেশনে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবীদের মৌলিক অধিকার রক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানান। বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের অফিশিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর এই গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্যের তথ্য ও সারসংক্ষেপ প্রকাশ করা হয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি উল্লেখ করেন যে আধুনিক প্রযুক্তির অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি আন্তর্জাতিক শিল্প-বাণিজ্য ও বিশ্ব অর্থনীতিতে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে। তবে স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় নতুন কর্মী নিয়োগ, কাজের পরিবেশ ট্র্যাকিং, কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন এবং কর্মসংস্থানসংক্রান্ত নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে অ্যালগরিদমের ক্রমবর্ধমান অপব্যবহার নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, আধুনিক প্রযুক্তি কাজের ধারাকে স্বয়ংক্রিয় ও দ্রুত করতে পারে, কিন্তু এটি কখনোই প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নীতিগত ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতাকে স্বয়ংক্রিয় করতে পারে না।
বর্তমান করপোরেট সংস্কৃতির আধুনিকায়নে অ্যালগরিদমিক সিদ্ধান্তের প্রভাব বাড়তে থাকায় ডেটা প্রাইভেসি, তথ্যের স্বচ্ছতা এবং বৈষম্যহীন কর্মপরিবেশ বজায় রাখা নিয়ে জটিল প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। ড. খলিলুর রহমান এআই ব্যবস্থার পরিকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তি প্রয়োগ প্রক্রিয়ায় বৈশ্বিক কোম্পানিগুলোকে তাদের কর্মচারীদের সরাসরি সম্পৃক্ত করার তাগিদ দেন। একই সঙ্গে অ্যালগরিদম বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত কোনো সিদ্ধান্ত যদি কর্মীদের জীবিকা বা পেশাগত ভবিষ্যৎকে প্রভাবিত করে, তবে সে বিষয়ে প্রশ্ন তোলার এবং তা পুনর্বিবেচনার আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ বহাল রাখার আহ্বান জানান।
ফোরামে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের ঝুঁকি নিয়েও বিস্তার আলোচনা করা হয়। প্রযুক্তির অপব্যবহারের ফলে দেখা দেওয়া সম্ভাব্য সাইবার আক্রমণ, অর্থনৈতিক মূল্যস্ফীতি এবং বিশ্ব আর্থিক খাতের তৈরি হওয়া ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার ও শিল্প খাতের শীর্ষ নেতৃত্বকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের অনুরোধ করা হয়। বিশেষ করে জাতিসংঘ গৃহীত ‘গ্লোবাল ডিজিটাল কমপ্যাক্ট’-এর মূল নীতিসমূহ অনুসরণ করে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি প্রতিটি শ্রমিকের অধিকারের কার্যকর আইনি সুরক্ষাব্যবস্থা বাস্তবায়নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে তাগিদ দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রযুক্তি ও মানবসম্পদের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা এখন সময়ের বড় দাবি। ড. খলিলুর রহমান বিশ্ব সম্প্রদায়কে একত্রিত হয়ে এমন এক মানবিক ডিজিটাল পরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যেখানে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন কোনোভাবেই মানুষের মৌলিক মানবাধিকার ও কর্মসংস্থানের নিরাপত্তাকে খর্ব করবে না। তিনি উল্লেখ করেন, কেবল অর্থনৈতিক মুনাফা নয়, বরং বিশ্বজুড়ে কর্মজীবী মানুষের সুরক্ষা ও সমতা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত বৈশ্বিক প্রযুক্তিনীতির প্রধান লক্ষ্য।
পরিশেষে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই দ্রুত বিকাশমান যুগে প্রযুক্তিকে মানবিক মূল্যবোধ ও দায়বদ্ধতার সঙ্গে সমন্বিত করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। বিশ্বজুড়ে শ্রমিকের মৌলিক স্বার্থরক্ষা এবং একটি বৈষম্যহীন ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে আগামী দিনগুলোতে রাষ্ট্র ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ দায়িত্বশীল পদক্ষেপই প্রধান ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
Published with WpNewblog — www.rameshpoudel.com