ব্যাংকিং অ্যাপের ব্যবহার বাড়ে তিন গুণ, গ্রাহকসংখ্যা দুই কোটি পার
8 October 2026 —
বাংলাদেশে ব্যাংকিং অ্যাপের ব্যবহার অভূতপূর্ব গতিতে বৃদ্ধি পেয়ে নতুন এক রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই শেষে দেশে নিবন্ধিত ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহারকারী গ্রাহকের সংখ্যা ২ কোটি ৯ লাখ ৭৫ হাজার অতিক্রম করেছে। মাত্র এক বছর আগে যেখানে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ৭১ লাখ ৬৬ হাজার, সেখানে এক বছরের ব্যবধানে ব্যবহারকারী বেড়েছে প্রায় ১ কোটি ৩৮ লাখ বা প্রায় তিন গুণ। স্মার্টফোনে আর্থিক সেবাগ্রহণ এবং কিউআর কোডভিত্তিক কেনাকাটার ব্যাপক প্রসারই মূলত গ্রাহকদের অ্যাপনির্ভর আধুনিক লেনদেনের দিকে দ্রুত ধাবিত করছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছরের শেষ দিক থেকেই ব্যাংকগুলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নতুন গ্রাহকদের অন্তর্ভুক্তি আশাতীতভাবে বাড়তে শুরু করে। গত বছরের নভেম্বর মাসে ব্যাংকিং অ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৮৫ লাখ ৭২ হাজার, যা ডিসেম্বরে এক লাফেই ১ কোটি ৪৯ লাখ স্পর্শ করে। এরপর প্রতি মাসেই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বজায় রেখে তা বর্তমান মাইলফলকে পৌঁছায়। জুলাই মাসের তথ্য অনুযায়ী, মোট ব্যবহারকারীর মধ্যে ১ কোটি ৬৭ লাখ ৭২ হাজারের বেশি পুরুষ এবং প্রায় ৩৮ লাখ নারী গ্রাহক রয়েছেন। এর মাধ্যমে স্পষ্ট যে, দেশে নারী গ্রাহকদের মধ্যেও ডিজিটাল আর্থিক সেবার সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও ব্যাংকারদের মতে, অ্যাপ ব্যবহারে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে সর্বজনীন ‘বাংলা কিউআর’ পরিশোধ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৩ সালে আন্তঃব্যাংক কোডভিত্তিক অর্থ পরিশোধ সুবিধা চালু করার পর চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে সব বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য বাংলা কিউআর ব্যবহারের নির্দেশ কার্যকর করে। এই ব্যবস্থার ফলে যেকোনো ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাপ দিয়ে সহজেই দ্রুত লেনদেন সম্পন্ন করা যাচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ব্যাংক হিসাবে দ্রুত টাকা জমা হওয়ার সুযোগ নিশ্চিত থাকায় ব্যবসায়িক কার্যক্রমেও অ্যাপভিত্তিক লেনদেনের প্রচলন দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, আগে অ্যাপভিত্তিক লেনদেনকে মূলত মোবাইল আর্থিক সেবার সঙ্গে সম্পর্কিত মনে করা হতো। তবে বাংলা কিউআর প্রবর্তনের পর ব্যাংকিং অ্যাপের প্রয়োজনীয়তা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যেসব ব্যাংকের নিজস্ব অ্যাপ ছিল না, তাদেরকেও এই সমন্বিত কাঠামোর আওতায় যুক্ত করা হয়েছে। একই সময়ে ব্রাউজারভিত্তিক ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহারকারীর সংখ্যা কিছুটা হ্রাস পেয়ে ২৪ লাখ ৮৯ হাজারে দাঁড়িয়েছে। তবে অ্যাপ ও ব্রাউজার মিলিয়ে দেশে মোট ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহারকারীর সংখ্যা বর্তমানে ২ কোটি ৩৪ লাখ ৬৪ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যা এক বছর পূর্বের ১ কোটি ১৯ লাখ ৬৭ হাজারের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।
গ্রাহক সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি অ্যাপের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেনের পরিমাণও অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছেছে। তথ্যানুযায়ী, কেবল গত জুলাই মাসেই ব্যাংকিং অ্যাপগুলোর মাধ্যমে ১ লাখ ৭৪ হাজার ১২৯ কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে, যা আগের বছরের আগস্টে ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। তবে একক মাস হিসেবে এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ লেনদেন রেকর্ড করা হয় গত জুন মাসে, যখন কোরবানির ঈদ উপলক্ষে কেনাকাটা ও নগদ অর্থ স্থানান্তরের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় ১ লাখ ৮৪ হাজার ৩৪৯ কোটি টাকার লেনদেন হয়।
সার্বিকভাবে, বাংলাদেশে স্মার্টফোননির্ভর ব্যাংকিং ব্যবস্থার এই অভাবনীয় প্রবৃদ্ধি ক্যাশলেস সমাজ ও সমৃদ্ধ ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ইতিবাচক বার্তা দিচ্ছে। ব্যাংকিং অ্যাপ, মোবাইল ওয়ালেট এবং সমন্বিত কিউআর ব্যবস্থার সহজলভ্যতা আগামী দিনে দেশের প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত ব্যাংকিং সেবাকে আরও সহজ, নিরাপদ ও দ্রুতগতির করে তুলবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
Published with WpNewblog — www.rameshpoudel.com