এআই সুশাসন নিশ্চিতে বৈশ্বিক সহযোগিতার সমন্বিত রূপরেখার তাগিদ
7 October 2026 —
সরকারি নীতি ও জনসেবা কার্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নীতিগত ব্যবহার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এআই সুশাসন এবং প্রযুক্তি বিনিময়ের ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তুরস্কের ইস্তাম্বুলে আয়োজিত দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী ১২টি দেশের পক্ষে যৌথ বক্তব্য উপস্থাপনকালে বাংলাদেশের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এই তাগিদ দেন। তিনি বলেন, বর্তমান ডিজিটাল বিভাজন যেন ভবিষ্যতে প্রযুক্তিভিত্তিক বৈষম্য সৃষ্টি না করে, সে জন্য দায়িত্বশীল নীতি ও টেকসই বৈশ্বিক রূপরেখা প্রণয়ন জরুরি।
ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল প্রয়োগভিত্তিক এআই সুশাসন, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ব্যাপকভাবে প্রযুক্তির উদ্ভাবন বিস্তার। দক্ষিণ কোরিয়া সরকার, আস্তানা সিভিল সার্ভিস হাব, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এবং তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের যৌথ উদ্যোগে এই সম্মেলনের উদ্বোধন করা হয়। এতে ককেশাস, মধ্য এশিয়া এবং এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী, শীর্ষ নীতিপ্রণেতা ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী জানান, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর কোনো দূরবর্তী সম্ভাবনাময় ধারণা নয়, বরং এটি সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নাগরিক পরিষেবা দ্রুত হস্তান্তরে মৌলিক রূপান্তর ঘটাচ্ছে। প্রযুক্তির ব্যবহারের গতির চেয়েও কীভাবে নৈতিক ও দায়িত্বশীল উপায়ে অ্যালগরিদমিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করা যায়, সেটিই এখন বড় পরীক্ষা। এ জন্য মানবকেন্দ্রিক আস্থার ভিত্তিতে প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর জোর দেন তিনি।
কার্যকর এআই সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার রূপরেখা তুলে ধরা হয়। প্রথমত, রাষ্ট্রীয় পরিচালনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ হতে হবে স্বচ্ছ, দায়বদ্ধ ও মানবকেন্দ্রিক। দ্বিতীয়ত, কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট ডেটা শাসন অবকাঠামো এবং সাইবার-আইনি নিরাপত্তা তৈরি করতে হবে। তৃতীয়ত, কোনো একক রাষ্ট্রের পক্ষে সব প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ সমাধান সম্ভব নয় বিধায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে প্রযুক্তি ও জ্ঞান বিনিময় অব্যাহত রাখতে হবে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রদত্ত বক্তব্য স্মরণ করে মন্ত্রী উল্লেখ করেন, আধুনিক প্রযুক্তি যেন কোনো নতুন সামাজিক বা অর্থনৈতিক অসমতার জন্ম না দেয়। বরং এটি যেন সমাজ ও রাষ্ট্রের বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধার ব্যবধান দূর করার সমতাভিত্তিক মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এই লক্ষ্যে প্রান্তিক ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং আন্তর্জাতিক স্তরে বিশেষায়িত কারিগরি প্রশিক্ষণ নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়।
প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বৈশ্বিক ফোরামেও সমান্তরাল আলোচনা চলছে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স আলোচনাতেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়ভার যন্ত্রের বদলে চিহ্নিত মানুষ বা প্রতিষ্ঠানের ওপর রাখার আহ্বান জানানো হয়। নীতিনির্ধারকদের মতে, এআই-ভিত্তিক ঝুঁকি ও বৈষম্য দূর করতে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হলো নিরাপদ প্রযুক্তি বিকাশের পথ।
ইস্তাম্বুলের এই হাই-লেভেল সম্মেলনের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত বিশ্বাস, উদ্ভাবন ও সর্বজনীন অন্তর্ভুক্তির একটি মুক্ত বৈশ্বিক ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। টেকসই প্রযুক্তি নীতি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে বিশ্বের কোনো দেশ যেন প্রগতির দৌড়ে পিছিয়ে না পড়ে, সেই দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবায়নে সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার প্রতি অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
Published with WpNewblog — www.rameshpoudel.com