প্রশ্নফাঁস চক্রের ৭ সদস্য গ্রেপ্তার: সরকারি কর্মচারীদের যুক্ত থাকার প্রমাণ
17 October 2026 —
প্রশ্নফাঁস চক্রের ৭ সদস্য গ্রেপ্তার করার মাধ্যমে স্মার্টফোন ও ডিজিটাল মেসেজিং অ্যাপভিত্তিক একটি বড় নেটওয়ার্ক উন্মোচন করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-৩)। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং উত্তর সরবরাহের ঘটনায় অভিযান চালিয়ে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের পাঁচ কর্মচারীসহ সাতজনকে আটক করা হয়েছে। একই ঘটনায় রাজধানীর বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা চলাকালে মোবাইল ফোনে প্রশ্নপত্র বাইরে পাঠাতে গিয়ে এক নারী পরীক্ষার্থী ভ্রাম্যমাণ আদালতের রায়ে এক মাসের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, গত ১০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত উক্ত নিয়োগ পরীক্ষায় ২৪২টি শূন্যপদের বিপরীতে তিন লাখেরও বেশি চাকরিপ্রার্থী অংশ নেওয়ার কথা ছিল। তবে পরীক্ষা শুরুর পূর্বেই অত্যন্ত দ্রুততার সাথে মেসেজিং অ্যাপে প্রশ্নপত্র ও ডিজিটাল সমাধান ছড়িয়ে পড়ায় তাৎক্ষণিকভাবে পুরো পরীক্ষা প্রক্রিয়া স্থগিত ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ। এরপর মতিঝিল থানায় মামলা দায়েরের ভিত্তিতে ছায়া তদন্ত শুরু করে এসআরবি। ডিজিটাল ফরেনসিক পর্যবেক্ষণে জানা যায়, পরীক্ষার দিন অতি প্রত্যুষেই একটি অজ্ঞাত উৎস থেকে চক্রটির কাছে প্রশ্নপত্রের স্পষ্ট ছবি পৌঁছায় এবং পরবর্তীতে তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
তদন্ত সূত্রে আরও স্পষ্ট হয়েছে যে, অপরাধী চক্রটি চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে চুক্তিভিত্তিক অর্থ আদায় করত। ব্যাংক চেক, নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প ও মূল সনদপত্র জমা নিয়ে মাথাপিছু ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে প্রশ্ন এবং সমাধান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হতো। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চালানো অভিযানে সাভার ও ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে আধুনিক মোবাইল হ্যান্ডসেট, প্রশ্নপত্রের অনুলিপি, ব্যাংকের চেক পাতা ও বিভিন্ন সরকারি পরীক্ষার প্রবেশপত্র জব্দ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গ্রেপ্তারকৃতদের পরিচয় বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের নিম্ন ও মধ্যম সারির কর্মচারীরা এই চক্রের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছিলেন। নিজেদের পদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে এবং অর্থ উপার্জনের প্রলোভনে পড়ে তারা প্রশ্ন তৈরি ও বন্টন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হন। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, অতীতে অন্য পরীক্ষাসংক্রান্ত জালিয়াতিতে অর্থ হারিয়ে তা পুষিয়ে নিতেও কেউ কেউ এই সিন্ডিকেটে জড়িয়ে পড়েছিলেন।
অন্যদের সাথে বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে সুনির্দিষ্ট ডিজিটাল জালিয়াতির অভিযোগে কেন্দ্র পরিদর্শকের হাতে রেশমা আক্তার নামে এক পরীক্ষার্থী আটক হন। পরে লালবাগ রাজস্ব সার্কেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে জেলে পাঠানোর নির্দেশ দেন এবং তাঁর ব্যবহৃত স্মার্টফোনটি আলামত হিসেবে জব্দ করেন।
এসআরবি ব্যাটালিয়নের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, গ্রেপ্তারকৃতরা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রশ্ন পাওয়ার দাবি করলেও এর নেপথ্যে থাকা মূল উৎস অনুসন্ধানে কাজ চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপ ও প্রোফাইল খতিয়ে দেখে প্রযুক্তিভিত্তিক তদন্ত জোরদার করা হয়েছে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিজস্ব কোনো কর্মী এতে যুক্ত না থাকলেও, রাষ্ট্রের অন্যান্য সংস্থায় কর্মরত অসৎ কর্মীদের অপতৎপরতা বন্ধে ও মূল পরিকল্পনাকারীদের চিহ্নিত করতে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
Published with WpNewblog — www.rameshpoudel.com