বিচারব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিচারকদের প্রজ্ঞা প্রয়োগের তাগিদ
20 September 2026 —
ঢাকা: বিচারব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট নিত্যনতুন প্রযুক্তিগত ঝুঁকি ও অ্যালগরিদমিক অপব্যবহার থেকে দেশের বিচারপ্রক্রিয়াকে সুরক্ষায় বিচারকদের সর্বোচ্চ প্রজ্ঞা প্রয়োগের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সমাপনী অনুষ্ঠানে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, কৃত্রিম উপাত্ত বা প্রযুক্তিনির্ভর ভুল তথ্যের মাধ্যমে মানুষের চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই সাক্ষ্য-প্রমাণ ও ডিজিটাল নথিপত্র বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে কোনো তথ্য এআই-সৃষ্ট কি না, তা প্রযুক্তিগত মানদণ্ডে গভীরভাবে ও সতর্কতার সঙ্গে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
রাজধানীর এশিয়াটিক সোসাইটি বাংলাদেশ মিলনায়তনে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ এআই গভর্নেন্স সামার স্কুল ২০২৬’ শীর্ষক পাঁচ দিনব্যাপী নির্বাহী পর্যায়ের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আইনমন্ত্রী এই দিকনির্দেশনা দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের উদ্যোগে এবং ‘লিগ্যালাইজড এডুকেশন বাংলাদেশ’ ও ‘দ্য সোসাইটি ফর জাস্টিস অ্যান্ড এআই’-এর সার্বিক সহযোগিতায় এই সময়ের উপযোগী প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন বিচারক, গবেষক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা এতে অংশ নিয়ে উদীয়মান প্রযুক্তির আইনি চ্যালেঞ্জ ও এর উত্তরণ নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেন।
বক্তব্যে আইনমন্ত্রী বর্তমান আধুনিক বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরে বলেন, এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে মানুষের কণ্ঠস্বর নকল করা, ছবি বিকৃত বা পরিবর্তন করা এবং ভুয়া তথ্যকে অতি নিখুঁতভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে বিচারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় কোনো বিচারককে যদি এআই-উৎপাদিত প্রলুব্ধকর বা বিকৃত ডিজিটাল কনটেন্টের মাধ্যমে বিভ্রান্ত করা হয়, তবে তা সরাসরি বিচারালয়ের নিরপেক্ষতা ও আস্থাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে। এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে একটি স্পষ্ট ও কার্যকর আইনি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, সমগ্র বিশ্ব দ্রুত গতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করলেও এই প্রযুক্তির ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সঠিক নীতিগত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখনো সম্পূর্ণ তৈরি হয়নি। উপযুক্ত নিয়ন্ত্রণ আইন প্রবর্তিত না হওয়া পর্যন্ত বিচারালয়গুলোতে যেকোনো মামলার সুরাহা ও রায় প্রদানের সময় বিচারকদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও বিচারিক প্রজ্ঞা প্রয়োগ করতে হবে। সরকার দেশে এআই প্রযুক্তি নিষিদ্ধ করার পক্ষে নয়, বরং প্রযুক্তির ইতিবাচক সম্ভাবনাকে সমৃদ্ধ করে এর সব ধরনের অপব্যবহার ঠেকাতে সুরক্ষাকবচ তৈরি করতে চায়।
আইন সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় নীতিমালা যুগোপযোগী করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন মন্ত্রী। তিনি আহ্বান জানান, শিক্ষক, প্রযুক্তি প্রকৌশলী, আইনবিদ ও বিশেষজ্ঞদের সমন্বিত মতামতের ভিত্তিতে যেন একটি ভারসাম্যপূর্ণ খসড়া আইন দ্রুত সরকারের কাছে পেশ করা হয়। কোনো একক সিদ্ধান্ত না চাপিয়ে বিচারব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের আইনি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরিতে যুক্তিতর্ক ও সব পক্ষের মতামতকেই প্রাধান্য দেবে সরকার।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ একরামুল হক এবং আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. বোরهان উদ্দিন খান প্রযুক্তি ও বিচারব্যবস্থার আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন। পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার তাসনুভা শেলী। তারা সবাই একমত পোষণ করেন যে প্রযুক্তিগত রূপান্তরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আইনি সুরক্ষাকে মজবুত না করলে ভবিষ্যতে তথ্যগত বিকৃতি বিচারে বড় ধরনের অন্তরায় সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারপ্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রবেশের ফলে নথিপত্র পর্যালোচনা ও আইনি গবেষণায় যেমন গতি আসছে, ঠিক তেমনি ডিপফেক ও ভুয়া ডিজিটাল প্রমাণের কারণে বিচারে ভুল সিদ্ধান্তের শঙ্কাও বাড়ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে এমন বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে বিচারক ও আইন পেশাজীবীদের সচেতন করার উদ্যোগ দেশের বিচার বিভাগকে ভবিষ্যতের সাইবার ও এআই-সংক্রান্ত জটিলতা মোকাবিলায় আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে সহায়তা করবে।
Published with WpNewblog — www.rameshpoudel.com